
মশক নিধনে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এরপরও শুষ্ক মৌসুমে কিউলেক্স ও বর্ষায় এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না সংস্থা দুটি। কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশা মারতে ফগিং বা ধোঁয়ার মাধ্যমে যে ওষুধ ছিটানো হয় তার কোনো কার্যকারিতা নেই, এটা লোক দেখানো।
নগরবাসীর অভিযোগ, প্রতিবছর ডেঙ্গু মৌসুম এলেই রাজধানীর অলিগলি ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। সিটি করপোরেশনের ফগিং মেশিন ঘুরে বেড়ায় সকাল-সন্ধ্যা। লার্ভা ধ্বংসে ছিটানো হয় কীটনাশক। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ডেঙ্গু সংক্রমণ কমার বদলে প্রতি বছর বাড়ছেই।
এখন প্রশ্ন উঠেছে কোটি কোটি টাকার মশার ওষুধ ছিটিয়েও কেন কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না? দেশি-বিদেশি গবেষণা, দেশের কীটতত্ত্ববিদেরা বলছেন, মশার ওষুধে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো- মশার ওষুধ প্রয়োগে ভুল পদ্ধতি। বিশেষ করে বিকেলে মশক নিধনে যে ফগিং করা হয়, তার ফলাফল শূন্য। ফগিংয়ে মশা মরে না। উল্টো জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি ও পরিবেশ দূষণ করে।
ফগিং কোনো কার্যকরী পদ্ধতি না। এটা এক রকম জনসাধারণকে দেখানো। ফগিং করে কেউ মশা মারছে এটা জানা নেই। নিজেও কখনো তা দেখিনি। তারপরও সিটি করপোরেশন তা করে যাচ্ছে।-ড. কবিরুল বাশার
রাজধানীতে মশক নিধনে সকালে লার্ভিসাইডিং ও বিকেলে অ্যাডাল্টিসাইডিং (ফগিং) করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এখানে ভুলটা কোথায়?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘ফগিং কোনো কার্যকরী পদ্ধতি না। এটা এক রকম জনসাধারণকে দেখানো। ফগিং করে কেউ মশা মারছে এটা জানা নেই। নিজেও কখনো তা দেখিনি। তারপরও সিটি করপোরেশন তা করে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি অনেকবার প্রশাসক বা মেয়রদের বলেছি, এটা যাতে না করে। তাদের কথা, ফগিং না করলে সিটি করপোরেশন মশক নিধনে কিছুই করে না, জনগণ এমনটা মনে করবে। এ ফগিং নিয়ে আইন হওয়া উচিত। এটি পরিবেশ দূষণ করে, মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে। সরকারকে বিষয়টি দেখা উচিত।’
২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘পেস্ট ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত বাংলাদেশভিত্তিক এক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার এডিস ইজিপ্টাই মশার মধ্যে বহুল ব্যবহৃত পাইরেথ্রয়েড শ্রেণির কীটনাশকের বিরুদ্ধে উচ্চমাত্রার প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
পরীক্ষাগারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বীকৃত পদ্ধতিতে পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা যায়, মানসম্মত মাত্রার পাইরেথ্রয়েড স্প্রে প্রয়োগের পরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মশা বেঁচে থাকে। কিছু পরীক্ষায় উড়ন্ত ও বিশ্রামরত মশার ৭৪ শতাংশ পর্যন্ত জীবিত ছিল। এ অবস্থায় শুধু একই ধরনের কীটনাশকের ওপর নির্ভর করলে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা ক্রমেই কমতেই থাকবে।
ওই গবেষণাটি আরও বলা হয়েছে, মশার শরীরে জিনগত পরিবর্তন এবং বিষ নিষ্ক্রিয়কারী এনজাইমের কার্যকারিতা বেড়ে যাওয়ায় কীটনাশক আগের মতো কাজ করতে পারে না। ফলে স্প্রে করার পরও অনেক মশা বেঁচে যায় এবং পরবর্তী প্রজন্মে সেই প্রতিরোধক্ষমতা ছড়িয়ে পড়ে। তাই একই কীটনাশক পাঁচ বছরের বেশি ব্যবহার করা উচিত নয়।