ঢাকা আজকের তারিখঃ | বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
হাদি হত্যা নিয়ে মন্তব্য, মমতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা পল্লবীতে আরেকটি গলিত লাশ উদ্ধার, স্বামী-সন্তান কানাডায় আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৬ শিশু মৃত্যুর কারণ জানালেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ভিসা-মাস্টারকার্ড লেনদেন বন্ধ, নতুন সংকটে কিউবা আবার বিয়ে করছেন আমির খান, পাত্রী কে মতলবে ৫ জুন এনসিপির জনসভা, প্রধান অতিথি নাসীরুদ্দীন, প্রধান বক্তা সারজিস বিদ্যুতের বাড়তি দাম থেকে রেহাই পাচ্ছে দুই শ্রেণির গ্রাহক যুবদলের নতুন কমিটি, সভাপতি মুন্না ও সম্পাদক নয়ন বিসিপিএস-এর নতুন নীতিমালা সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে এনডিএফ প্রচণ্ড গরমে সুসংবাদ দিল আবহাওয়া অধিদপ্তর চিড়িয়াখানায় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেখতে উপচে পড়া ভিড় বিশ্ববাজারে কমল তেলের দাম চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের আবারো মিছিল গরম নিয়ে বড় দুঃসংবাদ দিলো আবহাওয়া অফিস মমতার বক্তব্য ও হাদি হত্যা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া হিজাব পরে ড্রামসে ঝড়, পরিচয়ে যা জানা গেল একটি পক্ষ দেশকে অস্থিতিশীল করার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে:মির্জা ফখরুল এআই খরচে লাগাম টানছে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো কুয়াকাটায় ভেসে এলো ৪৫ ফুটের বেলিন তিমি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়িতে চোরাগোপ্তা হামলা

ধারদেনায় চলছে হামে আক্রান্ত বেশির ভাগ শিশুর চিকিৎসা

ধারদেনায় চলছে হামে আক্রান্ত বেশির ভাগ শিশুর চিকিৎসা ছবির ক্যাপশন: সংগৃহীত

দীর্ঘ সাত বছরের প্রতীক্ষা জুয়েল-ছালমা দম্পতির। অবশেষে তাদের কোলজুড়ে আসে প্রথম সন্তান। একমাত্র সন্তান জামিলাকে (২) ঘিরেই তাদের সব স্বপ্ন আর সুখের পৃথিবী। কিন্তু সেই সুখের সংসারে হঠাৎ করেই নেমে এসেছে দুঃস্বপ্ন।

মেয়ের প্রথমে ঠান্ডা-জ্বর থেকে নিউমোনিয়া হয়। পরে হামে আক্রান্ত হলে ফরিদপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে সেখান থেকে নিয়ে আসে রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে। বর্তমানে সে হাসপাতালের আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) চিকিৎসাধীন।

একদিকে আদরের সন্তানের অসুস্থতায় উদ্বিগ্ন, অন্যদিকে চিকিৎসার খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে পরিবারটি। শিশুটির বাবা জুয়েল হোসেন বলেন, ‘আমার মেয়ে আইসিইউতে ১২ দিন ধরে আছে। মেয়ের মুখের দিকে তাকানো যায় না। হাম আমার ছোট্ট মেয়েটিকে অনেক কষ্ট দিচ্ছে। ওষুধপত্র, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় এখন পর্যন্ত দুই লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। এর মধ্যে ৫০ হাজার টাকা কিস্তিতে নিয়েছি।

আর ভাইবোনের কাছ থেকে ৬৫ হাজার টাকা ধার করেছি। এখন আমার পকেটে ৫০০ টাকাও নেই। আবার ঋণ করার জন্য আত্মীয়স্বজনদের কাছে ফোন করেছি। তা না হলে মেয়েকে চিকিৎসা করাব কীভাবে!’

নাঈম হোসেন নামে আরেক শিশুর বাবা বলেন, ‘আমি ভ্যানগাড়ি চালাই। দিন আনি, দিন খাই। আমার এখন পর্যন্ত ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ছেলেকে চিকিৎসা করাতে গিয়ে একদম শেষ হয়ে গেছি। যারা একবার টাকা দিয়েছে, তারা আর দিতে চায় না। কলিজাটা ফেটে যাচ্ছে। কারো কাছে বলতে পারছি না, সইতেও পারছি না। শুধু এ দুই পরিবার নয়, হামে আক্রান্ত এমন অসংখ্য শিশুর পরিবারের একই অবস্থা।

দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে। প্রতিদিন নতুন নতুন রোগী ভর্তি হওয়ায় শয্যার সংকটে বারান্দা, করিডর, ওয়ার্ডে এখন উদ্বিগ্ন স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা। কেউ সন্তানকে বাঁচাতে ধারদেনা করছেন, আবার কেউ শেষ সম্বলটুকুও হারাচ্ছেন চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে। আবার অনেক পরিবার চিকিৎসা চালাতে গিয়ে ঋণের জালে আটকে পড়ছেন, কেউ কেউ সন্তান হারিয়ে শোকের পাশাপাশি বহন করছেন দেনার বোঝা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা ব্যয়ের আশঙ্কায় অনেক নিম্ন আয়ের পরিবার অসুস্থ শিশুকে শুরুতেই হাসপাতালে নিতে দ্বিধায় পড়ে। ফলে রোগের অবস্থা গুরুতর হয়ে যাওয়ার পরই তারা চিকিৎসার জন্য ছুটে যান। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, ওষুধ, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং পুষ্টিকর খাদ্যের অতিরিক্ত ব্যয় পরিবারের আর্থিক সংকটকে আরো গভীর করে তোলে।

হামের চিকিৎসায় কত খরচ

দেশে হামের চিকিৎসায় গড় ব্যয় নিয়ে এখনো কোনো সরকারি গবেষণা নেই। তবে মহাখালীর ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং বেশ কয়েকটি বেসরকারি ক্লিনিকে হামের চিকিৎসা নেওয়া অন্তত ২০ শিশুর অভিভাবক ও স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালে তিন দিন থাকলে রোগীপ্রতি খরচ হচ্ছে ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা। আবার রোগীর জটিলতা কিংবা বেশি দিন থাকলে খরচ ৫০ হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

আর বেসরকারি হাসপাতাল/ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারে খরচ কয়েকগুণ বেশি। মানহীন সাধারণ একটি ক্লিনিকে প্রতিদিন গড়ে ব্যয় হচ্ছে ২০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এছাড়া শিশুদের আইসিইউ বা পিআইসিইউ (পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) প্রয়োজন হলে প্রতিদিন গড়ে ৩০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। আবার নামকরা কোনো ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গড়ে তিন লাখ টাকারও বেশি খরচ হচ্ছে। সন্তানের চিকিৎসার জন্য আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী বা এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো। আবার কেউ কেউ গয়নাও বিক্রি করে দিচ্ছেন। আর এই খরচের মধ্যে রয়েছে রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ কেনা, যাতায়াত ও ঢাকায় থাকা-খাওয়া।

রাজধানীর শিশু হাসপাতালের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে এক সপ্তাহ ধরে ছেলের চিকিৎসা করাচ্ছেন গাজীপুরের মিনা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী একটি কোম্পানির গাড়ি ড্রাইভার। সামান্য যা বেতন পান, তা দিয়েই আমাদের সংসার চলে। কিন্তু বাচ্চা অসুস্থ হওয়ার পর প্রথমে গাজীপুরে একটি ক্লিনিকে ভর্তি করি। সেখানে তিন দিনে বিল আসে ৬০ হাজার টাকা। যা জমানো টাকা ছিল, সব খরচ হয়ে যায়। পরে ঋণ করে ঢাকায় আসি। এখানেও ওষুধপত্র, থাকা-খাওয়াসহ প্রতিদিন দুই হাজার টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। সমিতি থেকে ঋণ নিয়েছি, ধারদেনা করে কোনোরকমে এখন চিকিৎসা চলছে।’

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা আরমান হোসেন বলেন, ‘আমি আমার বাচ্চাকে নিয়ে তিন হাসপাতালে ভর্তি করেছি। তাতে আমার ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। পরে ঢাকায় এসেছি। এখানে ভর্তির পর খরচ কম। তবুও ব্লাড সিরাম টিআইবিসি, হিমোগ্লোবিন পরীক্ষাসহ অনেক পরীক্ষা করাতে হয়। আবার অনেক ওষুধপত্রও বাইরে থেকে কিনতে হয়। আমরা গরিব মানুষ। ধারদেনা ও ঋণের ওপর এখন চিকিৎসা চলছে। জানি না কেমন করে এই দেনা শোধ করব।’

শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম বলেন, কোনো শিশু যখন হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়, তারা হাম থেকে সুস্থ হয়ে উঠলেও নিউমোনিয়া থেকে সেরে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগে। ফলে রোগীদের খরচ বাড়ছে। কোনো শিশুর জটিল অবস্থা হলে ইনজেকশন দিতে হয়। যার দাম ছয়-সাত হাজার টাকার মতো, যা অনেক পরিবারের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। তবে হাসপাতালে আইজিএম পরীক্ষাসহ প্রায় ৯০ শতাংশ পরীক্ষা সরকারি খরচে করা হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের পরিবারের মধ্যে বেশিরভাগই হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষ। চিকিৎসা ব্যয়ের আশঙ্কায় অনেক নিম্ন আয়ের পরিবার অসুস্থ শিশুকে শুরুতেই হাসপাতালে নিতে দ্বিধায় পড়ে। আবার অনেক শিশু পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। এ জন্য মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ছে। কারণ, তারা দরিদ্র পরিবারের সন্তান। যেখানে তারা তিন বেলা খেতেই হিমশিম খায়, সেখানে পুষ্টিকর খাবার কীভাবে খাবে।

তিনি বলেন, আর্থিক অবস্থা যা-ই থাকুক, চিকিৎসা খরচ জোগাতেই হিমশিম খাচ্ছে নিম্নবিত্তরা। তাই সবার জন্য প্রাথমিক ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নিশ্চিত করতে হবে।

অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১৫ মার্চ থেকে ২ জুন সকাল ৮টা পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে ৭৩ হাজার ৩৬২ জন। আর এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামের রোগী পাওয়া গেছে ৯ হাজার ১৩৬। এ সময়ে সন্দেহজনক হাম উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৯ হাজার ১০৬ জন। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত হাম থেকে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৮১২ জন।


নিউজটি আপডেট করেছেন : সিকান্দার আবু সাইম

কমেন্ট বক্স