বান্দরবান সীমান্তে অপরাধী চক্রের তৎপরতায় বাড়ছে মাইন বিস্ফোরণে প্রাণহানির ঘটনা। এতে করে সীমান্ত এলাকায় জনমনে দেখা দিয়েছে চরম আতঙ্ক। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্ত যেন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। গত মঙ্গলবার আবার মাইন বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছেন আবদুল খালেক নামে এক রোহিঙ্গা শ্রমিক। বারবার এমন ট্র্যাজেডিতে সীমান্ত লাগোয়া এলাকাবাসীর মধ্যে এখন চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে এর ফলে হতাহতের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে সক্রিয় থাকা রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে দেশটির সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষ চলছে। জানা গেছে, ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে আরাকান আর্মির হাতে। এর বাইরে আরো চারটি রোহিঙ্গা গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এই সংঘর্ষের মধ্যেই মাইন বিস্ফোরণের ফলে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা হতাহত হচ্ছেন।
জানা গেছে, ঘটনাটি ঘটেছে ঘুমধুম ইউনিয়নের রেজু আমতলী বিজিবি ক্যাম্পের পূর্বপাশে বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্ত পিলার ৪০-এর নিকটবর্তী মাস্টার শাহ আলমের বাগানে। আবদুল খালেক সেখানে দিনমজুরের কাজ করতে গিয়েছিলেন। কাজে থাকা অবস্থায় অসাবধানতাবশত মাটিতে পুঁতে রাখা মাইনের ওপর পা পড়ে। এতে বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি। নিহত আবদুল খালেক কুতুপালং-১, সি-ব্লকের বাসিন্দা আনু মিয়ার ছেলে। দুর্ঘটনাস্থল কক্সবাজারের ৩৪ বিজিবি নিয়ন্ত্রিত। তবে সীমান্তে ক্রমাগত মাইন বিস্ফোরণ ও হতাহতের ঘটনায় স্থানীয়রা এখন ভয়ে দিন পার করছেন। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমার সীমান্তে মাইন বসানো হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সীমান্ত প্রশাসন এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য প্রদান করেনি। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, তারা দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। এই সমস্যার টেকসই সমাধান না হলে, ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি আরো বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সীমান্তের প্রবীণ বাসিন্দা নুরুল ইসলাম, রশিদ আহমদ, হামিদুল হকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মিয়ানমার সীমান্তের অভ্যন্তরে একসময় বিপুল গাছপালা ও গভীর অরণ্য ছিল। সেই সময় জীবন-জীবিকার তাগিদে এ পাড়ের বহু মানুষ পাহাড়ে কাঠ ও বাঁশ কাটতে যেত। কিন্তু কালের বিবর্তনে মিয়ানমার সীমান্ত এখন বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়েছে, বসানো হয়েছে কাঁটাতারের বেড়াও। বর্তমানে ওপারে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে বাংলাদেশের সীমানা লাগোয়া এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে ‘আরাকান আর্মি’। ওপার থেকে এখন এপারের মানুষের দিকে সার্বক্ষণিক অস্ত্র তাক করে রাখা হয়। ফলে সাধারণ মানুষের ওপারে যাওয়ার সব পথ বন্ধ।
মিয়ানমারের বিদ্রোহীরা এই চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ তাদের নির্দিষ্ট জায়গায় বসাতে অথবা নিজেদের সীমান্ত সুরক্ষিত রাখার অজুহাতে আন্তর্জাতিক সীমানার জিরো পয়েন্টে মাইন স্থাপন করছে।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং ১৯৮৭ সালের চুক্তি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সীমান্তে স্থল মাইন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তা সত্ত্বেও মিয়ানমার অভ্যন্তরের সংঘাতের জের ধরে জিরো পয়েন্টে প্রতিনিয়ত মাইন পোঁতা হচ্ছে।
সিকান্দার আবু সাইম